মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় উপসাগরীয় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শহর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দোহা, আবুধাবি, দুবাই ও মানামায় হামলার ঘটনায় শুধু স্থাপনা নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ভাবমূর্তিও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
উপসাগরীয় দেশগুলো—বিশেষ করে কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন—এ অঞ্চলের অন্যান্য সংঘাত থেকে নিজেদের দূরে রাখার কৌশল নিয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক হামলার পর তারা কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে পড়েছে: পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানাবে, নাকি পরিস্থিতি সামাল দিতে সংযত থাকবে।
শনিবার সন্ধ্যায় ইরান ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। এতে সংযুক্ত আরব আমিরাতে অন্তত তিনজন নিহত ও ৫৮ জন আহত হয়েছেন। কাতারে ১৬ জন, কুয়েতে ৩২ জন, ওমানে ৫ জন এবং বাহরাইনে ৪ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থায় ধ্বংস হওয়া ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ দুবাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভবন ও বিমানবন্দর, মানামার বহুতল ভবন এবং কুয়েতের বিমানবন্দরে আঘাত হানে। দোহাতেও কয়েকটি এলাকায় ধোঁয়া দেখা যায়। সৌদি আরব জানিয়েছে, রাজধানী রিয়াদ ও পূর্বাঞ্চলেও ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত করেছে।
এর আগে শনিবার ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরানে হামলা চালায়। এতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং আরও কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়। ইরানের বিভিন্ন সামরিক ও সরকারি স্থাপনাও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। দেশটির একটি স্কুলে হামলায় অন্তত ১৫০ জন নিহত হয়েছেন বলে জানানো হয়েছে, যাদের বেশির ভাগই শিশু।
এই হামলার আগে ওমান–এর মধ্যস্থতায় তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা চলছিল। আলোচনায় ইরান সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত না করার বিষয়ে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছিল বলে জানা যায়। তবে হামলার ফলে সেই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ভেস্তে গেছে।
New York University Abu Dhabi–এর মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতিবিষয়ক অধ্যাপক মোনিকা মার্কস বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর সাধারণ মানুষ ও নীতিনির্ধারকদের কাছে নিজেদের শহরে বোমাবর্ষণের দৃশ্য সম্পূর্ণ অচেনা ও অস্বাভাবিক অভিজ্ঞতা।
তার মতে, উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি)ভুক্ত দেশগুলো কয়েক সপ্তাহ ধরেই পরিস্থিতির অবনতি আঁচ করছিল এবং সংঘাত এড়াতে চেষ্টা চালাচ্ছিল। তারা আশঙ্কা করছিল, কোণঠাসা ইরান প্রতিশোধমূলক হামলায় প্রতিবেশী দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলোর সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তাদের বিদ্যুৎ গ্রিড, পানি পরিশোধন প্ল্যান্ট ও জ্বালানি অবকাঠামো। তীব্র গরম ও শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে এসব অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে জনজীবন মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হতে পারে।
পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে, আর উপসাগরীয় দেশগুলো এখন এমন সিদ্ধান্তের মুখে দাঁড়িয়ে আছে, যা তাদের নিরাপত্তা, কূটনীতি ও আঞ্চলিক ভারসাম্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।